এডওয়ার্ড জেনার | গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কারক

এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner): আজ থেকে দুশো বছর আগে সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর হাজারে হাজারে মানুষ মারা যেত বসন্ত রোগে। বসন্ত রোগ নানা রকমের হয়। তার মধ্যে সবচাইতে মারাত্মক হল গুটিবসন্ত। 

এই রোগ হলে খুব কম লোকই বাঁচত। আর যারা বাঁচত তাদের কারও চোখ নষ্ট হয়ে যেত, কারও বা সারা শরীরে বিশ্রী ক্ষতচিহ্ন থেকে যেত। এখন কিন্তু বড় একটা গুটিবসন্ত হয় না। 

এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner)

এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner)
এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner)

দুশো বছর আগে এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner) নামে একজন ইংরেজি চিকিৎসক বসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন। সেই টিকাই বসন্তের হাত থেকে মানুষকে বাঁচিয়েছে। 

এমন একটা রোগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচিয়েছেন বটে, কিন্তু ডাক্তার জেনারের কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। অনেক দিনের চেষ্টা আর পরিশ্রমে, অনেক লোকের নিন্দা উপেক্ষা করে তবে জেনার পেরেছেন বসন্তের টিকা আবিষ্কার করতে।

জেনারের জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডের বার্কলি নামের একটি জায়গায় ১৭৪৯ সালের ১৭ মে। তাঁর বাবা ছিলেন ওখানকার গ্রামের ধর্মযাজক। গ্রামের স্কুলেই জেনারের লেখাপড়া চলতে লাগল। 

ছোটবেলায় পশুপাখি আর গাছপালা তাঁকে খুবই আকর্ষণ করত। তবে একটু বড় হয়ে ডাক্তার হবার ইচ্ছেটাই হয়েছিল সবচেয়ে প্রবল।

তখনকার দিনে কেউ ডাক্তার হতে চাইলে আগে একজন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যাপারগুলো শিখে নিতে হতো। তবেই তাকে কোনো মেডিক্যাল স্কুলে বা কলেজে ভরতি করা হতো। 

জেনার ব্রিস্টল শহরের কাছে একটা ছোট জায়গায় লাডলো নামে একজন চিকিৎসকের কাছে কিছুদিন ডাক্তারি শেখেন। তারপরে পাঁচ-ছয় বছর লন্ডনের ডা. জন হান্টার নামে এক শল্যচিকিৎসকের কাছে শিক্ষালাভ করেন। 

এরপর জেনার পুরোদস্তুর ডাক্তার হন এবং লন্ডনের সেন্ট জর্জ হাসপাতালে চিকিৎসকের কাজ পান। আর ঠিক এসময় এমন একটা ঘটনা ঘটে, যা তাঁর জীবনটাকেই অন্য দিকে নিয়ে গেল।

এসময় জেনারের পরিচিত এক গোয়ালিনি তাঁকে দুধ দিতে আসত। এই মেয়েটির হাতে ছিল গো-বসন্তের ঘা। গরু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে এই রোগ হতো। তবে গো-বসন্ত আসল বসন্তের মতো সাংঘাতিক রোগ নয়। 

সেই সময়ে একবার ওই মেয়েটির গ্রামে বসন্তের মড়ক দেখা দিলে জেনার তাকে সাবধান করে দেন। মেয়েটি বলল যে তার কোনো ভয় নেই। কারণ যার গো-বসন্ত একবার হয়েছে তার আর কখনো বসন্ত হবে না।

প্রথমে জেনার এই কথাটা প্রায় হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরে তাঁর মনে হল ব্যাপারটা সত্যি কি না তা যাচাই করে দেখলেই তো হয়। তাঁর শিক্ষক ডা. হান্টারও তাঁকে এ নিয়ে গবেষণা করতে বললেন।

১৭৯৬ সালে জেনারের একটা সুযোগ জুটে গেল। তিনি তার বাড়ির মালির ফিস নামে একটি আট বছর বয়সের ছেলের শরীরে গো-বসন্তের বীজ ঢুকিয়ে দিলেন। 

তারপর যখন তার গো-বসন্ত হল তখন তিনি তার শরীরে আসল বা গুটি বসন্তের বীজ ইঞ্জেকশন করে ঢুকিয়ে দিলেন। কিছুদিন পরে ছেলেটির গো-বসন্ত সেরে গেলই, এমনকী গুটি বসন্তও হল না। 

জেনার তো আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেলেন। তার মানে গো-বসন্তের বীজ দিয়ে আসল বসন্তকে ঠেকানো যায়।

আরও দু'বছর জেনার এটা নিয়ে পরীক্ষা করলেন। তাঁর আর কোনো সন্দেহই রইল না যে, গো-বসন্তের বীজ যদি টিকার মতো কোনো লোকের শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া যায় তবে তার বসন্ত হবে না।

এবার জেনার সারা জগৎকে জানাতে চাইলেন তাঁর আবিষ্কারের কথা। কিন্তু তখনও অনেকেই জেনারের আবিষ্কারকে সন্দেহের চোখে দেখলেন। 

তবে ধীরে ধীরে লোকে মেনে নিল সব। আর জেনারের এই আবিষ্কারের ফলে গুটি বসন্তে মৃত্যুর হার অনেক কমে গেল। 

দেশ-বিদেশের জ্ঞানীগুণী মানুষ জেনারকে অভিনন্দন জানাতে লাগলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'স্যার' উপাধি দিয়ে সম্মান জানালেন।

একসময় যে রোগ ছিল সারা পৃথিবীতে একটা ভয়ের ব্যাপার, তার হাত থেকে মানুষকে বাঁচালেন জেনার। আজ যে পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে বসন্ত প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে, সে তো তাঁরই জন্যে।

১৮২৩ সালে টিকার আবিষ্কর্তা জেনারের মৃত্যু হয় তাঁর জন্মস্থান বার্কলিতে।

Source:




এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner)

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post