হিটলার ও মুসোলিনির উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

এডলফ হিটলার -প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে জার্মানিকে নাৎসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তার পরিকল্পনা ছিল সর্বাধিক। অপরদিকে একই সময়ে ইতালিকে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রধান ব্যক্তি ছিলেন বেনিতো মুসোলিনি। 

হিটলার ও মুসোলিনির উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

হিটলার ও মুসোলিনির উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
হিটলার ও মুসোলিনির উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ


হিটলার ও মুসোলিনির কর্মকাণ্ডের তুলনা


পটভূমি

ফ্যাসিবাদ এবং নাৎসিবাদ -দু'টো আলাদা শব্দ হলেও রাজনৈতিক আদর্শের উৎপত্তি, ধরন এবং কর্মকাণ্ডে এরা এক ও অভিন্ন চরিত্রের। বস্তুত যা ফ্যাসিবাদ তাই নাৎসিবাদ, যা নাৎসিবাদ তাই ফ্যাসিবাদ বললে অত্যুক্তি করা হবেনা। 

শব্দদু'টি দুই দেশে প্রয়োগ হলেও রাজনীতিতে এর কার্যকারিতা একই। ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং স্বরূপ দৃশ্যমান হয়েছে ইতালিতে মুসোলিনির মাধ্যমে, অন্যদিকে নাৎসিবাদের প্রকাশ ঘটেছে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে। 

ইতালি এবং জার্মানি রাষ্ট্র হিসেবে আলাদা, মুসোলিনি ও হিটলারও ব্যক্তি বা সরকার আইন হিসেবে আলাদা ছিলেন। কিন্তু দুজনেই উগ্র জাতীয়তাবাদকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশসহ অন্যান্য দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন, সমরাভিযান পরিচালনা করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়ে সভ্যতাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। 

সমাজের সর্ব নিম্নস্তর থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত উগ্র জাতীয়তাবাদ তথা ফ্যাসি-নাৎসিবাদের প্রচারণায় যে ভাবাবেগ ঐ দুটো দেশে তৈরি করা হয়েছিল তার মূলে ছিল হিটলার ও মুসোলিনির রাজনৈতিক উগ্র উচ্চাভিলাষত্ত্ব হঠকারী রাজনীতি। 

তাদের দু'জনের উগ্র হঠকারী কর্মকাণ্ডই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। (ক) বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ ও একনায়কত্ব শুরুতে মুসোলিনি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শকে একটি জাতীয় আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এর কোনো দলও তখন ছিল না। 

প্রাচীন রোমের আবেগকে তিনি কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে চারদিকে যে মত চলছিল তাতে ইতালির জনগণ প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে মুসোলিনিকে তারা তখন তাদের দুচে (নেতা) মনে করে। 

মুসোলিনি প্রথমে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। এর নাম রাখেন Fascio। তিনি ঘোষণা করেন যে, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা থেকে তিনি ইতালিকে মুক্ত করবেন। 

স্বেচ্ছাসেবকরা কালো পোশাক পরে কুচকাওয়াজ করতো। স্বেচ্ছাসেবকগণকে নিয়মানুবর্তিতা মানতে হতো, ১৯১৯ সালের পর থেকে Fascio স্বেচ্ছাসেবীরাই ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হয়। 


সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবীদের সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। রাজা ভিক্তর ইমানুয়েল পরোক্ষভাবে ফ্যাসিওদের সমর্থন প্রদান করেন। 


ইতালির ধনিক শ্রেণি তাদেরকে বিপুলভাবে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে।

চিত্র: রোম দখলের পর স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে মুসোলিনি।


১৯২২ সালে মুসোলিনি হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে রোম দখল করেন। সামরিক বাহিনীসহ সরকারের সকল শক্তিই ফ্যাসিওদের প্রতি দুর্বল ছিল। 


ফলে নির্বাচিত সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। রাজা মুসোলিনিকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এভাবেই ইতালির রাষ্ট্র ক্ষমতায় মাত্র তিন বছরের মধ্যে ফ্যাসিওরা অধিষ্ঠিত হয়।

ক্ষমতা দখলের পর পরই মুসোলিনি আসলরূপে আবির্ভূত হন। সব জায়গা থেকে বিরোধী দল ও বিরোধী মতের মানুষদের বিতাড়িত করেন, প্রশাসনকে ফ্যাসিকরণ করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলুপ্ত করেন, নিজের অনুকূলে আইন প্রণয়ন করেন, স্বায়ত্তশাসিত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত করেন। 

ইতালির চেম্বার অব ডেপুটিস বিলুপ্ত করে ২২ টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করেন। অবশেষে ১৯২৫ সালে মুসোলিনি নিজেকে দুচে তথা ইতালির নেতা উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন সকল ক্ষমতার আধারে, প্রতিষ্ঠা করেন ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র।

মুসোলিনির পররাষ্ট্রনীতির চিন্তাধারা ও প্রয়োগ|


(i) যুদ্ধবাজনীতি 

ক্ষমতা গ্রহণ করে মুসোলিনি ঘোষণা করেন, “আমি যুদ্ধ ভালোবাসি, যুদ্ধ করা আমার সহজাত প্রবণতা”। এ উপলক্ষে মুসোলিনি ইতালির পদাতিক, নৌ, বিমান বাহিনীকে ঢেলে সাজান। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধের মানসিকতায় প্রস্তুত করেন। 

উদ্দেশ্য যুদ্ধের মাধ্যমে ইতালির সম্প্রসারণ ঘটানো, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতালিকে সামরিকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা।

(i) সাম্রাজ্য বিস্তার 

মুসোলিনি মনে করতেন যে, ইতালিকে শক্তিশালী করার একমাত্র উপায় হচ্ছে সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে। তাতে ইতালির বাজার সৃষ্টি হবে, কাঁচামাল সংগ্রহ করা যাবে। নতুবা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ ইতালি সহ্য করতে পারবে না। 

মুসোলিনি ইতালির সাম্রাজ্যবাদী নীতি বাস্তবায়ন করার জন্যে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রাখা, উভয় দেশকে জার্মানির বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে রাখা এবং সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে এ দেশগুলোকে উত্তপ্ত রাখা। 

মুসোলিনি তার এ সব কৌশল প্রয়োগ করে বেশ কিছু উপনিবেশ পুনরুদ্ধারে সফল হন। ৯৩ সালে গ্রিসের কুর্ফুদ্বীপ গ্রিসকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তা ফেরত নিতে হয়। মুসোলিনির ভাবমূর্তি নিজ দেশে তাতে বেড়ে যায়।

(iii) প্রতিবেশী ফ্যাসিবাদীদের প্রতি সমর্থন 

মুসোলিনি শুধু নিজের দেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ফ্যাসিবাদী শর উত্থানকে নানাভাবে সহযোগিতা প্রদান শুরু করেন। ১৯৩১ সালে স্পেন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। 

কিন্তু স্পেনের অভ্যন্তরের দক্ষিণপন্থি শক্তিসমূহ এর বিপক্ষে গোপনে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। ১৯৩৬ সালের নির্বাচনে পপুলার ফ্রন্ট জয়লাভ করলে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনের দক্ষিণপন্থিরা অভ্যুত্থান ঘটালে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। 


মুসোলিনি জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বাহিনীকে সমর্থন করেন। উদ্দেশ্য ছিল স্পেনে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে মমতায় অধিষ্ঠিত করা। একই সঙ্গে ফ্রান্সকে দক্ষিণ দিক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জার্মানির জার্মানির হিটলার সরকার। 

ইউরোপের ২৭টি রাষ্ট্র স্পেনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করায় নীতি ইতালি ও জার্মানির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গৃহযুদ্ধে ফ্রান্সের বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়।

(iv) ইতালি-জার্মানির ঐক্য 

স্পেনের গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইতালি ও জার্মানির নৈকট্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও স্পেনে মুসোলিনি ফ্রাঙ্কোকে জার্মানির চেয়ে অনেক বেশি সহায়তা প্রদান করেছিল, কিন্তু সুবিধা আদায়ে হিটলার অনেক বেশি সক্ষম হয়েছিল। 

তারপরও হিটলার এবং মুসোলিনি ইউরোপে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে ফ্যাসি-নাৎসি জোট গঠনে সক্রিয় ছিল। ভার্সাই চুক্তি-বিরোধী মানসিকতা হিটলার এবং মুসোলিনির মাধ্যমে দুই দেশেই প্রবল হতে হাকে। 

হিটলার তেমন প্রেক্ষাপটে মুসোলিনিকে জোট গঠনের প্রস্তাব দিলে মুসোলিনি সম্মতি প্রদান করেন। আবেসিনিয়া (ইথিওপিয়া)-য় ইতালির আক্রমণ কালেই (১৯৩৪-৩৫) হিটলার মুসোলিনিকে অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিলেন। 

ফলে স্পেনের নতুন প্রেক্ষাপটে হিটলার এবং মুসোলিনি আরও সক্রিয়ভাবে জোট গঠনে এগিয়ে আসেন। ১৯৩৯ সালে ইতালি ও জার্মানির মধ্যে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

১৯৩৯ সালে জার্মানি যুদ্ধ শুরু করার পর ইতালি ১৯৪০ সালে যুদ্ধে যোগদান করে। যুদ্ধে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার প্রত্যয়ে ১৯৪০ সালের ১৯ জুন মিউনিখে হিটলার এবং মুসোলিনি মিলিত হন। 

মুসোলিনি হিটলারের কাছ থেকে নিস, কর্সিকা, সোমালিল্যান্ড, তিউনিসিয়া মাল্টাসহ কয়েকটি অঞ্চল দাবি করেন। তবে হিটলার অনেক বেশি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে তখন যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যস্ত ছিলেন। 

তিনি ফ্রান্সকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে, ইতালিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে দূরে রাখার কৌশলে লিপ্ত ছিলেন। তবে ১৯৪২ সালের পর যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তিত হতে থাকে। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ফ্রন্টে জার্মানি বাহিনীকে প্রতিহত করে, আফ্রিকায় ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনী ইতালিকে পরাস্ত করতে থাকে। হিটলার ও মুসোলিনি বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, যার যার অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 

ইতালিতে মুসসালিনির বিরুদ্ধে জনমত বেড়ে ও জনগণের দুরাবস্থায় নায়ক হিসেবে মুসোলিনি চিহ্নিত হতে থাকেন। ১৯৪৩ সালের ২৪ জুলাই রাজা ভিক্তর ইমানু তাকে অপসারণ করেন। মুসোলিনি বন্দি হন। 

তবে জার্মান বাহিনী তাকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসে। উত্তর ইতালিতে জার্মান অধিকৃত অঞ্চলে তাকে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান করা হয়। 

তবে ইতালিতে ততোদিনে মিত্রপক্ষের বাহিনী মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। ১৯৪৪ সালে রোম মিত্রপক্ষের হস্তগত হয়। 

১৯৪৫ সালে উত্তর ইতালিতে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। সেখান থেকে পালাতে গিয়ে মুসোলিনি মিত্র বাহিনীর কাছে ধৃত এবং নিহত হন। পরিসমাপ্তি ঘটে ফ্যাসিবাদী মুসোলিনির ধ্বংসাত্মক যুগ।

পরের অংশ পড়ুন এখানে   


Next Post Previous Post