ক্যারিয়ার গঠনের নিয়ম - পর্ব- ০১ (Career Building Rules Part- 01)

ক্যারিয়ার গঠন

ভবিষ্যতে নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ এবং পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার ক্ষেত্রে প্রথমেই নিজ নিজ ক্যারিয়ার গঠনে যত্নবান হতে হবে। ভালোভাবে ক্যারিয়ার গঠন করতে হলে বিশেষ কিছু গুণ ও দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। ক্যারিয়ার গঠনে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু গুণ ও দক্ষতা নিচে আলোচনা করা হলো:

 

Career structure

ক্যারিয়ার গঠন: ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (Career structure: Positive attitude)

মানবজীবনে সাফল্যের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিশেষ অথচ অদৃশ্য উপাদান। জন্মের পর থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠার সময়ে মানুষের মধ্যে অজান্তেই আদর্শ এবং দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে থাকে। পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা, পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে এ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মনে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।

মানুষ যে কোনো বিষয় বা কাজের ক্ষেত্রে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে। একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে তা নির্ভর করবে সে কেমন শিক্ষা পাচ্ছে, কেমন পরিবেশ বা সমাজে বেড়ে উঠছে এবং কোন সংস্কৃতিকে লালন করছে। এজন্য একই বিষয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, ও রাষ্ট্রভেদে একেক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়।

দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ হচ্ছে মনোভাব, মানসিকতা বা চিন্তার ধরন। অর্থাৎ একটি বিষয়কে কে কীভাবে দেখছে বা কীভাবে নিচ্ছে সেটিকে বলা যায় তার দৃষ্টিভঙ্গি। দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে মানুষের মনোজাগতিক আদর্শ যার আলোকে সে যে কোনে বিষয়কে বিচার করে।

কোনো বিষয়কে ভালোভাবে নেওয়া বা ঐ বিষয়ের প্রতি ভালো মনোভাব পোষণ করা কিংবা বিষয়টিকে ইতিবাচক মানসিকতার মাধ্যমে গ্রহণ করাই হচ্ছে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

 

ক্যারিয়ার গঠন : ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব (Career structure: The importance of a positive attitude)

পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে সমাজের সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজের সকলের সঙ্গে আন্তরিকতা ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

মানুষের ব্যক্তিত্বের মধ্যেই তার স্বকীয়তা বিদ্যমান থাকে। যে যত বেশি ব্যক্তিত্ববান সে তত বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে।

সমাজে জিনি যত জনপ্রিয় তিনি মানুষের কাছে ততটাই শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়ে থাকেন। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করা সহজ হয় এবং এ ধরনের মানুষকে সবাই পছন্দ করে।

ফলে সমাজে বিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধার অধিকারী হয়। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। এতে সাফল্যের পথ সুগম হয়।

ক্যারিয়ার গঠন : ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গঠন (Career structure: Formation of a positive attitude)

বিভিন্নভাবে ইতিবাচক ‍দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে পারে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিভা ও শক্তিকে জাগ্রত ও প্রস্ফুটিত করে।

শিক্ষার সংস্পর্শে এসে মানুষ তার মনন ও চিন্তন দক্ষতাকে শাণিত করতে পারে। এর মাধ্যমে তার চিন্তা করার ধরন ও মনোভাবের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটে। ফলে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব তৈরি হয়।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও লালন করে।

এভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবের সাথে সাথে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যও পরিলক্ষিত হয়। মানুষের মানসপট গঠিত হয় তার পরিবার ও সমাজ থেকে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যগণ কোন বিষয়কে কীভাবে বিবেচনা করেন সেটি দেখে পরিবারের অন্য সদস্য দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে।

অপরদিকে সমাজে বসবাস করার পাশাপাশি মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ থেকেও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে। সামাজিক বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান, পারস্পরিক সম্পর্ক, ধর্মীয় অনুশীলন, বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব পরিশীলিত হয়।

মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। নানা রকমের ঘটনা-দুর্ঘটনার প্রভাব মানুষের মনোভাব পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাস্তব জীবনে কোন ঘটনা থেকে সে কী শিক্ষা পেল এবং তার কোন ধরনের অভিজ্ঞতা হলো এর ওপর ভিত্তি করে তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।

যে কোন ঘটনার নেতিবাচক দিকের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়ার মাধ্যমে এ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা যায়।

মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা মানুষকে জীবন চলার পথ নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে মানুষের স্বকীয়তা ও ব্যক্তিত্ব পুনর্গঠিত হয়।

প্রত্যেক সভ্যতা ও সমাজের নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি ও সংস্কার আছে। এসব কৃষ্টি, সংস্কার ও রীতি-নীতি মানুষের মানসিকতাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। ফলে তার মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

 

ক্যারিয়ার গঠন : ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকা (Career structure: The role of positive attitude)

ব্যক্তিগত জীবনে বা পেশাগত কারণে মানুষকে নানা ধরনের মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। ইতিবাচক দৃ্ষ্টিভঙ্গি পোষণ করলে মানুষের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করা অনেক সহজ হয়।

সম্পর্ক ভালো থাকলে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যায় যা ক্যারিয়ার গঠনে সহায়ক। ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক সময় কাউকে কাউকে বেশ চিন্তিত দেখা যায়, যা তার মানসিক অবস্থার উপর অনেক চাপ তৈরি করে।

ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করলে মনের উপর থেকে অনেক চাপ কমে যায়। ফলে মনোযোগ ও দক্ষতার সাথে যেকোনো কাজ সম্পাদন করা যায়।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে কাজে উৎসাহ ও মনোযোগ বাড়ে। যারা এ ধরনের মনোভাব পোষণ করে তারা কোনো কাজকে হীন মনে করেন না এবং কাজ করার প্রতি তাদের কোনো অবহেলা থাকে না।

ফলে তারা ব্যাপক আগ্রহ ও ‍উদ্দীপনার সাথে কাজ করতে পারে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করলে যেকোন সমস্যা সহজেই সমাধান করা যায়।

অনেকে আছে যারা নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে সেটিকে আরো জটিল করে তোলে।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা সমস্যা সমাধান করতে চায় তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে সমস্যাটির সমাধান এবং সহজেই তারা তা করতে পারে।

 

ক্যারিয়ার গঠন : আত্মসচেতনতা (Career structure: Self-awareness)

আত্মসচেতনতা বলতে বোঝায় নিজের ব্যাপারে সচেতনতা। অর্থাৎ নিজের ভালো-মন্দ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। কিসে মঙ্গল আর কিসে অমঙ্গল সে ব্যাপারে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা।

আমি কী কাজ করছি, কেন করছি, কোন উপায়ে করছি, কাজের ফলাফল কী, কাজটির কোনো নেতিবাচক দিক আছে কি না, কাজটির ফলে নিজের বা অন্যের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কি না? এসব বিষয়ে ‍নিজের উপলব্ধিকে আত্মসচেতনা বলে।

 

ক্যারিয়ার গঠন : আত্মসচেতন হওয়ার গুরুত্ব (Career structure: The importance of being self-aware)

আত্মসচেতন মানুষ জীবনে কখনো বড় ধরনের বিপদে পড়ে না। কারণ তারা নিজের ভালো-মন্দ সম্পর্কে অবহিত থাকেন। সমাজের অন্যদের চেয়ে এ ধরনের মানুষ অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।

আত্মসচেতন থাকার গুরুত্ব অনেক। আত্মসচেতন মানুষ পূর্বেই যেকেনো অমঙ্গল, বিপদ, ক্ষতি, বা অনভিপ্রেত অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন বা অনুমান করতে পারে।

ফলে তারা পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়। তারা বিপদে পড়লে দ্রুত সামলে নিতে পারে।

 

ক্যারিয়ার গঠন : আত্মসচেতন হওয়ার উপায় (Career structure: Ways to be self-aware)

আত্মসচেতন হওয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে পারিপার্শ্বিক সকল বিষয়ে ধারণা রাখা। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সকল বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। শিক্ষা মানুষের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়, ফলে সে ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী সচেতন হয়ে যেকোনো কাজ সাফল্যের সাথে করতে পারে।

অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে সচেতন হওয়া সম্ভব। নিজের অভিজ্ঞতা, পরিবার ও সমাজের অন্যান্য সদস্যের অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায়।

আত্মসচেতন হওয়ার ক্ষেত্রে সমসাময়িক বিষয়াবলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলমান ঘটনাপ্রবাহে নজর রাখা এবং বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে আত্মসচেতনতাবোধ তৈরি হয়।

পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা আত্মসচেতন হওয়ার আরেকটি দিক। যে ব্যক্তি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানে এবং সচেতন থাকে সে নিজের সম্পর্কেও সচেতন থাকে।

 

ক্যারিয়ার গঠন : আত্মসচেতনতার ভূমিকা (Career structure: The role of self-awareness)

সচেতন থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায়ে যেকোনো ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হয়। আত্মসচেতন মানুষ নিজেদের ভালো-মন্দ নিজেরা অনুধাবন করতে পারে বিধায় ক্যারিয়ারের কোন সময়ে কোন সিদ্ধান্ত  নিলে সেটি ভালো হবে তা তারা বুঝতে পারে।

অনেক সময় ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হতে পারে। গৃহীত সিদ্ধান্তটি সঠিক নাও হতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে সচেতন ব্যক্তিরা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করে দ্রুত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা তাদের ক্যারিয়ারকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে দেয়।

একজন মানুষ কতটুকু সফল তা বোঝা যায় তার অর্জন থেকে। আত্মসচেতন মানুষ তাদের নিজেদের অর্জন নিজেরাই মূল্যায়ন করে থাকে। ফলে তাদের পক্ষে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়ে যায়।

অন্যের উপর নির্ভর্রশীল হলে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া যায় না। তাছাড়া অন্যের প্রতি নির্ভরশীলতা মানুষকে তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে ঠেলে দেয় এবং তারা স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে।

Wiki

Conclusion:

আত্মসচেতনতা অন্যের প্রতি নির্ভরশীল না হওয়ার শিক্ষা দেয়। আত্মসচেতন ব্যক্তি কখনো অন্যের ‍উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকে না।

Last Line: ক্যারিয়ার গঠন পর্ব- ০১  (Career structure Part- 01)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url