নিশাচর পাখি লক্ষ্মীপেঁচা (Barn Owl) Tyto alba

বাংলাদেশের সব জায়গাতেই লক্ষ্মীপেঁচা আছে। খােদ রাজধানী শহরে অনেক লক্ষ্মীপেঁচার বাস। পুরনাে দরদালানের ফাঁকফোকর ও গাছের কোটরে বিশ্রাম করে সারাদিন। রাতে বেরয়। লক্ষ্মীপেঁচার ইংরেজি নাম Barn Owl। বৈজ্ঞানিক নাম Tyto alba, শরীরের মাপ ৩৪-৩৬ সেন্টিমিটার।

লক্ষ্মীপেঁচা (Barn Owl) Tyto alba

পুকুরপাড়ে যেন গলাগলি জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে গাছ তিনটি। একটি হিজল, একটি বকুল ও একটি তেঁতুল। এই তিনটি গাছের ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দুটি নারকেল গাছ। সুন্দর দৃশ্য।

ওই জায়গাটা থেকে মাত্র হাত নয়েক দক্ষিণে একখানা দো-চালা বাংলাঘর। বাঁশের বেড়া। চারপাশে ছােট ছােট চারটি জানালাও আছে।

ওই হিজল-বকুল-তেঁতুল গাছে একটি করে মােট তিনটি মাটির কলস কাত করে বাঁধা। বারােমাসই বাঁধা থাকে ওগুলাে, কেননা মাঘের শেষে ওগুলােতে খোড়লের মৌমাছিরা চাক বাঁধে, গােল মতাে চাকটা ভাঙলে যথেষ্ট পরিমাণে মধু পাওয়া যায়।

এখন এই হেমন্ত শেষে গাছেরা যখন ঝরিয়ে দিচেছ হলুদাভ পাতা, বাতাসে ভাসছে শীতের গন্ধ, তখন ওই তিনটি কলস ফাঁকা। অবশ্য সুযােগ পেলেই ওই কলসে বাসা বাঁধে দোয়েল, শালিক, নীলকণ্ঠ ও বালিহাঁসেরা কিন্তু কলস তিনটির মালিক ওদের বাসা ভেঙে দেয়-পাখিরা বাসা বাঁধলে ওই কলসে মৌমাছিরা বসতে চায় না সহজে।

সন্দরবন এখান থেকে খুব কাছাকাছি। মাঘ-ফাল্গনে ওই কলসে মৌচাক হবেই হবে । শুধু এই তিনটি কলস নয়, এই তল্লাটের এমন একটি বাড়িও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে বাড়ির কোনাে না কোনাে গাছে ঠিলা-কলস বাধা নেই। উদ্দেশ্য অভিন্ন মৌচাক ও মধু।

তাে সেই হেমন্তকালের এক সকালবেলায় ৫টি ছাতারে পাখি বসল এসে সেই হিজল গাছটিতে। সারাক্ষণই চেঁচায় ওরা, করে লাফালাফি।

ওই লাফলাফির এক পর্যায়ে একটি ছাতারে চড়ে বসল কাত করা কলসটির মুখে, ভেতরে উঁকি দিয়েই ওটা ‘ওরে ডাকাত ডাকাত!” বলে চিৎকার দিয়ে উল্টে গেল। আর যায় কোথা! ৫টি ছাতারে এবার সমানে চেঁচামেচি শুরু করল, হিজলের ডালে যেন ঝড় উঠল।

উঠোনে টান টান হয়ে শুয়ে থাকা কুকুরটি সােজা হয়ে বসে কৌতূহলে তাকিয়ে রইল ওদিকে। প্রথমেই উড়ে এসে যে পাখিটি বসল হিজলের মাথায়, সেটি হচ্ছে দুধসাদা দুধরাজ। তারপর একে একে এল দুটি বুলবুল, একটি ফিঙে, ফটিকজল, একটি দোয়েল, একটি মৌটুসী। চারটি ভাত শালিক, চারটি ঝুঁটি শালিক ও তিনটি ধৌলি ফিঙে।

সবাই বুঝে ফেলেছে শত্রু আছে ওই কলসের ভেতর। এটা পাখিদের একটা চিরন্তন স্বভাব-লুকানাে কোনাে শত্রুর সন্ধান পেলে ওরা একজোট হয়। চেচায়, লাফায়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

হিজল,বকুল গাছের ডালে ডালে ঝড় তুলে পাখিরা সমানে চেঁচাচ্ছে, যেন বা সমস্বরে বলছে : সাবধান! সাবধান! ভেতরে ডাকাত! ধর-মার-কাট!

পাখিদের মহাসােরগােলে বাড়ির ছেলেপুলেরাও কৌতূহলী হল। জড়াে হল গাছতলায়। সবার ধারণা-কলসের ভেতরে সাপ, না-হয় গাছখাটাশ ঢুকে বসে আছে। তাই ওরাও শুরু করল হইচই। এ সময়ে দুধরাজটি দারুণ সাহসে বসল গিয়ে কলসটির মুখে বলতে গেলে ভেতরে ঢুকেই সে ঠোকর মারল শত্রুকে, অমনি কলসের ভেতর থেকে মুখ বাড়াল লক্ষ্মীপেঁচাটি।

হয়তাে-বা ও চাইছিল পিচ্চিগুলােকে ভয় দেখাবে। কিন্তু গাছতলায় মানুষ দেখে সঁ করে ভেতরে শরীর টেনে নিল আবার। পাখিদের তখন কী উত্তেজনা! কী চিৎকার! ছেলেগুলােও চেঁচাচ্ছে। ব্যাটা লক্ষ্মীপেঁচা! ও কী দিনের আলােয় বেরয় সহজে, নাকি বেরুবার জো আছে । বেরুলেই অন্যসব পাখিরা বলে ‘ধর ধর', ধাওয়া করে তল্লাট পার করে দেয়, পিঠের ওপরে ঠক ঠক করে ঠোকর মারে ।

একটি ছেলে গাছে উঠে পড়ল। কলস ধরে দিল অল্প নাড়া। তাও কি বেরুতে চায় লক্ষ্মীপেঁচা? অন্য পাখিদের ধাওয়া আর ঠোকর কী জিনিস তা ভালােই জানে। অপরাধ তাে বিশেষ কিছুই না।

মাঝে মধ্যে সুযােগ পেলে অন্য পাখির ডিম-বাচ্চা খেয়ে ফেলে। সুবিধাও আছে । অন্য পাখিরা তাে রাতে চোখেই দেখে না। কিন্তু লক্ষ্মীপেচা নিশাচর। তাছাড়া উড়তেও পারে নিঃশব্দ ডানায়। শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি অতিশয় প্রখর।কী আর উপায়? কলস তাে নড়ছে তো নড়ছেই।

মাথার কাছে মানুষ নামক শত্রু। তাই দু'তিনবার বাইরে ভেতরে করে অবশেষে লক্ষ্মীপেঁচাটি ঝট করে দিল উড়াল। সে কী উড়াল! ওড়ার গতি বােধ হয় ঘণ্টায় ৬০ মাইল হবে।

অমনি ‘ধর ধর, মার মার, গেল গেল’ বলে সব পাখিরা ধাওয়া করল। পুকুর পাড়ি দিয়ে খােলা মাঠে পড়ল পেঁচাটি । তারপর তীরবেগে উঁচু-নিচু হয়ে উড়ে ঢুকে পড়ল মাঠের মাঝখানের একটি উঁচু বিদ্যুৎ-টাওয়ারের ভেতর।

ভাগ্য ভালাে যে, টাওয়ারটি যশরে লতায় পুরােপুরি ছাওয়া, যেন-বা একটি সবুজ মিনার। অবশ্য এটুকু পাড়ি দেবার পথেই পিঠে মাথায় অনেকগুলাে জবর ঠোকর হজম করতে হয়েছে পেঁচাটিকে।

এই যে লক্ষ্মীপেঁচা, আমার বিচারে সে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিরীহ ও সুন্দর পেঁচা। অন্য পেঁচাদের চেয়ে সে প্রকৃতি ও মানুষের ঘনিষ্ঠতর বন্ধু। সে কৃষকের পরম বান্ধব।

বাংলাদেশের অন্য পেঁচাদের মুখ গােলাকার, কিন্তু লক্ষ্মীপেঁচার মুখ অদ্ভুত, অন্য রকম। পানপাতা, বটপাতা বা মানুষের হৃদপিণ্ডের মতাে মুখখানা কেমন যেন একটা কৌতুক কৌতুক ভাব আছে। হাসি হাসি চেহারা!

ওই যে হিজলগাছের ভেতরের কলসিতে বসে ছিল সে, পেটের তলায় ছিল সাদা সাদা ৮টি ডিম, তা দিচ্ছিল। যে ছেলেটার কলস সে আর নষ্ট করে নি ডিমগুলাে, ভেবেছে বাচ্চা ফুটলে ভালাে মজা হবে।


লক্ষ্মীপেঁচার পরিচিতি

লক্ষ্মীপেঁচার ইংরেজি নাম Barn Owl। বৈজ্ঞানিক নাম Tyto alba, শরীরের মাপ ৩৪-৩৬ সেন্টিমিটার।

পুরুষের চেয়ে মেয়েরা সামান্য বড় হয়ে থাকে। এদের মুখের গড়নের সঙ্গে যেমন দুনিয়ার অন্য কোনাে পেঁচার (ভারত-নেপালের ঘাসপেঁচা ছাড়া) মিল নেই, তেমনি কণ্ঠস্বরও অন্য পেঁচাদের মতাে ভয়ঙ্কর, ভয় জাগানিয়া নয়। ধাতব ‘ক্রিচ ক্রিচ, হিসস সিস, ক্রি ক্রি’, স্বরে ডাকে।

কেবল বাসা ছাড়া বা উড়তে শেখা ছানারা খিদের কান্নায় যখন মা-বাবাকে ঘিরে ধরে, তখন ওদের কণ্ঠস্বর ছড়ায় অনেকদূর পর্যন্ত। | লক্ষ্মীপেঁচার বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এদের মুখমণ্ডলের গড়ন বানরের মুখমণ্ডলের সাথে মিলিয়ে নেয়া যায়।

তাই এদের আরেক নাম বানরমুখাে পেঁচা। এই পেঁচা হিন্দু সম্প্রদায়ের লক্ষ্মীদেবীর বাহন। মুখমণ্ডলের রঙ সাদা, চোখ বেতফলের শাঁসের মতাে কালাে, চকচকে।

কপাল আর ঠোটের আদল এমন যে, মনে হয় আফ্রিকান বেবুনের নাক। ঠোটের পাশে আবার গোঁফের মতাে অতি সূক্ষ্ম একটা টান চলে এসেছে ঠোটের গােড়া পর্যন্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ঠোট খুব ছােট। কিন্তু তা নয়।

শরীরের তুলনায় মাথাটা বেশ বড়, গােলগাল । একনজরে লক্ষ্মীপেঁচার মাথা-পিঠ-ঘাড় ও পাখার উপরিভাগের রঙ ধূসর, হালকা ও সােনালি রঙের মিশেল-মনে হয় চকচক করছে, তাতে আবার চমৎকার সাদাটে ও কালচে ছিট। গলা-বুক-পেট সাদা, পা-ঢাকা লােমও সাদা।

শরীরের এই নিচের অংশগুলােতে (পা বাদে) হালকা হলুদ রঙের ছিট আছে। লক্ষ্মীপেঁচাদের সারা শরীরে যেন আৰ লাগানাে (ছিটগুলাে}। এদের ডানার তুলার রঙ সাদা, লেজের তুলার রঙ লালচেহলুদ। এই লালচে হলুদের ওপর কয়েকটি পাথালি কালাে টান আছে। এদের পালকগুলাে মখমলের মতাে নরম ও পেলব।

নখরগুলাে বড়শির মতাে বাঁকা, জোরালাে ও ধারালাে । মাথা গােলাকার, ডানা লম্বাটে, লেজ খাটো। দুরন্ত শিকারি এবং ওড়ায় দক্ষ। অন্য পেঁচাদের মতাে লক্ষ্মীপেঁচার চোখ বড় বড় নয়।

বাংলাদেশের সব জায়গাতেই লক্ষ্মীপেঁচা আছে। খােদ রাজধানী শহরে অনেক লক্ষ্মীপেঁচার বাস। পুরনাে দরদালানের ফাঁকফোকর ও গাছের কোটরে বিশ্রাম করে সারাদিন। রাতে বেরয়।

নিশাচর, তাই নিবিড় পর্যবেক্ষণ কঠিন। এরা আছে সুন্দরবনে, আছে বান্দরবানে আর গারােপাহাড়ে। এরা আছে গ্রামে-গঞ্জে এবং ছােট শহরে। বাংলাদেশের বাইরে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মায়ানমারেও আছে।

লক্ষ্মীপেঁচার মূলখাদ্য নানা জাতের ইঁদুর, হােক ঘরের নেংটি কিংবা মাঠের বড় কালাে ইঁদুর (ওজন প্রায় ২ কেজি)। এছাড়া খায় কাঠবিড়ালি, ছােট সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, পাখি, চামচিকা ও পাখির ডিম-বাচ্চা। ধেনাে ইদুর খুবই প্রিয় খাবার।

রাতের ধানক্ষেত-আলুক্ষেতে ইঁদুর শিকার করার সময় কখনাে কখনাে লড়াই লাগে বনবিড়াল ও সাপের সাথে, কেননা ওরাও ইদুর খায়। বিষধর সাপ ধরে লক্ষ্মীপেঁচারা। ওরা শ্রবণশক্তি দিয়েই শিকারের নড়াচড়ার সঠিক জায়গাটা শনাক্ত করতে পারে।

বিষধর সাপ ধরার জন্য আমি ১৯৬৫ সালে বড়শিতে ব্যাঙ গেঁথে ফেলে রেখেছিলাম, তাতে একটি লক্ষ্মীপেঁচা আটকে ছিল।

লক্ষ্মীপেঁচা বছরে দু’বার ডিম-বাচ্চা তােলে। কোনাে কারণে ওগুলাে নষ্ট হলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আবারাে ডিম পাড়ে। ডিম প্রায়শ ৬টি, কখনাে ৭টি ও ৯টি। দু’জনে পালা করে তা দেয়। বাসা আকারে বড় হলে দুজনে এক সাথেই তা দেয়। তাছাড়া দিনে বাসায় থাকতে হয় বলে ডিম বুকেই বসতে হয়।


ডিমের রঙ সাদা। অনেকটা গােলাকার ধরনের, ফোটে ৩০-৩৩ দিনে। ছানাদের বয়স মাসখানেক হলে বাসার ভেতর থেকে বেরিয়ে আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করে । ৫/৭টি ছানা যখন পাশাপাশি বসে থাকে শরীরে শরীর মিশিয়ে, তখন দেখতে ভারি সুন্দর লাগে।

মা-বাবা খাবার মুখে এলেই ওরা আগে খাবার জন্য ঠেলাঠেলি লাগায়, চেঁচায়। ছানারা উড়তে পারে ৫২-৫৫ দিন বয়সে। আরাে মাস খানেক মা-বাবার সাথে থাকে। তারপর আলাদা হয়ে যায়।

নতুন উড়তে শেখা ছানারা বােকার হদ্দ থাকে বলে প্রায়ই মানুষের হাতে ধরা পড়ে এবং কাক-চিলসহ অন্যান্য পাখিদের নাগালে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়।

প্রয়ােজন না হলে বাসায় কোনাে উপকরণ ব্যবহার করে না। আমার বাসার চিলেকোঠার ডালা ও বাক্সে গত ২০ বছরের ভেতর ৯ বার ডিম-বাচ্চা তুলেছে লক্ষ্মীপেঁচা। তার ভেতর ২ বার ডিম পেড়েছিল ৯টি করে। কাকেরা দূর থেকে মাঝে-মধ্যে হল্লা করত বটে, তবে সুবিধা করতে পারে নি।

১৯৭৪ সালে একটি লক্ষ্মীপেঁচার ছানাকে আমি তাঁতিবাজারের বুনাে বানরদের হাতে দেখেছিলাম। ওরা ছানাটিকে নিয়ে খেলছিল। কী জানি, স্বগােত্রীয়ই ভেবেছিল কিনা!

অপরের বাসা দখলের প্রবণতাও লক্ষ্মীপেঁচাদের রয়েছে। আবার নিরিবিলি পরিবেশ হলে মানুষের ঘরের ভেতরেও বাসা করতে পারে।

Conclusion:

১৯৭১ সালে এক হিন্দুবাড়ির (কেউ ছিল না টানা ৮ মাস) রান্নাঘরের ঝুলন্ত শিকের ভেতরের মাটির হাঁড়িতে লক্ষ্মীপেঁচার ৭টি ডিম দেখেছিলাম।

এরা একই বাসা বার বার ব্যবহার করতেও ভালােবাসে। পাহাড়-টিলাময় এলাকায় এই পেঁচা পাহাড়-টিলার খাজ বা খোদলে বাসা করে।

বর্তমান বাংলাদেশে লক্ষ্মীপেঁচারা যথেষ্ট ভালাে অবস্থায় আছে। খাদ্যাভাব নেই, নেই বাসা করার জায়গার সঙ্কট। ভালাে থাক এই মহাউপকারী পাখিটি।

কৃষকের বন্ধু হয়েই সে টিকে থাকুক আরাে বহুকাল সােনার বাংলায়।ছানা অবস্থায় ধরলে পােষ মানে, বাঁচে ১৫ বছর।

Last line: নিশাচর পাখি লক্ষ্মীপেঁচা (Barn Owl) Tyto alba


শরীফ খান







Post a Comment

0 Comments